পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় - জেনে নিন ৯ টি ঘরোয়া উপায় |
পাইলস বা অর্শ্বরোগ যা হেমোরয়েড নামে পরিচিত। বতর্মানে এটি একটি কমন সমস্যা যা সকল বয়সের মানুষের মধ্যে দেখা দেয়। পাইলসের ফলে মলদ্বারের শিরাগুলো ফুলে যায় এবং পায়খানা করতে অনেক কষ্ট হয়। এজন্য অনেকেই পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় সম্পর্কে জানতে চায়।আমাদের আজকের এই আর্টিকেলে পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় নিয়ে আলোচনা করব৷ কাজেই আর্টিকেলটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
তাছাড়া আরো আলোচনা করব -পাইলস এর লক্ষণ, পাইলস হওয়ার কারণ, পাইলস এর চিকিৎসা ওষুধ, পাইলসের ব্যাথা কমানোর ঘরোয়া উপায়।
আর্টিকেল সূচিপত্র - পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় সংশ্লিষ্ট সূচিপত্র
- পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায়
- পাইলস এর লক্ষণ
- পাইলস হওয়ার কারণ
- পাইলস এর চিকিৎসা ওষুধ
- পাইলসের ব্যাথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
- লেখকের মন্তব্য
আরও পড়ুনঃ নরমেনস ট্যাবলেট খাওয়ার কতদিন পর মাসিক হয়
পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায়
পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় নিয়ে পোস্টের শুরুতেই আলোচনা করব -
পাইলস হচ্ছে মলদ্বারের এমন একটি রোগ যাতে মলদ্বারের রক্তনালী ফুলে যায় এবং মলদ্বারের বাইরে বেরিয়ে আসে। এটি হচ্ছে একটি ব্যাথাহীন অসুখ। পরিপাকতন্ত্রের বৃহদান্ত্রের শেষের দিকের একটি অংশ হচ্ছে রেকটাম। এই অংশে অসংখ্য জালিকা থাকে। এসব রক্তজালিকা প্রয়োজন অনুযায়ী সংকোচিত ও প্রসারিত হয়। কোনো কারণে এসব জালিকার উপরে অতিরিক্ত চাপের ফলে পাইলস হয়ে থাকে।
অভ্যন্তরীন পাইলস এবং বহিঃস্থ পাইলস নামে দুই ধরনের পাইলস দেখা দেয়। আভ্যন্তরীন পাইলসে পাইলসটি মলদ্বারের দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার ভিতরে থাকে। পায়খানা করার সময় বেরিয়ে আসে আবার আপনা আপনি ভেতরে চলে যায়৷
আবার বহি:স্থ পাইলসের ক্ষেত্রে পাইলসটি সাধারণত মলদ্বারেই সবসময় অবস্থান করে। পাইলস থেকে যদিও চিরতরে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব তবুও পাইলসের উপসর্গ কমানো সম্ভব এবং দীর্ঘসময় যদি ফলো করেন তাহলে চিরতরে মুক্তি পেতে পারেন।
খাদ্যাভাস পরিবর্তন :
খাদ্যাভাসের প্রভাব পাইলস হওয়ার জন্য বিরাট ভূমিকা পালন করে। পাইলস না হওয়ার জন্য ফাইবার যুক্ত খাবার গ্রহণ করুন। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্ট ফুড পরিহার করুন৷ অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
ব্যায়াম
প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ব্যায়াম যেমন - তলপেটের ব্যায়াম,কেগেল ব্যায়াম,যোগব্যায়াম করুন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এসব ব্যায়াম পাইলস থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করবে।
সিটজ বাথ :
পাইলসের ব্যাথা ও অস্বস্থি কমানোর জন্য প্রতিদিন সিটজ বাথ করতে পারেন। দৈনিক ১৫-৩০ মিনিট সিটজ বাথ করুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণ :
আপনার যদি অতিরিক্ত ওজন থাকে তাহলে ওজন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন। কেননা অতিরিক্ত ওজন আপনার পাইলসের উপর প্রভাব ফেলতে পারে৷
ধূমপান ও মধ্যপান পরিহার করা
মধ্যপান ও ধূমপান করলে তা পাইলসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কাজেই এগুলো পরিহার করে চলুন।
কোষ্ঠকাঠিন্য পরিহার করা
আপনার যদি দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে তাহলে তা পরিহার করার জন্য বিভিন্ন আঁশযুক্ত খাবার, কলা, ফলমূল ইত্যাদি খান। পাশাপাশি বিভিন্ন লেক্সাটিব ওষুধও খেতে পারেন। আপনার যদি কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা থাকে তাহলে অবশ্যই তা পরিহার করতে হবে৷ নতুবা আপনার পাইলস কখনো ভালো হবে না।
স্বাস্থ্যসম্মত শৌচচর্চা করা :
পায়খানা করার সময় অতিরিক্ত সময় বসে থাকা যাবে না। কেননা বসে থাকলে আপনার চাপ বেশি পড়বে এবং পাইলস হতে পারে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা :
সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করুন। কেননা অপরিষ্কার শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বাধে। কাজেই পায়ুপথ সবসময় পরিষ্কার করতে হবে।
যদি উপরোক্ত পদ্ধতি গুলো অনুসরণ করে আপনার ভালো ফলাফল না দেখা দেয় তাহলে একজন বিশেষজ্ঞ সার্জারি ডাক্তারের পরামর্শ নিন।পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির আরেকটি উপায় হচ্ছে সার্জারি। চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই সার্জারি করবেন।সাধারণত দুইভাবে পাইলসের পরীক্ষা করা হয়। এক.শারিরীক পরীক্ষা :এই পরীক্ষার সময় বাহ্যিক অবস্থা দেখেই পাইলসের অবস্থা নির্ণয় করেন। আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে প্রোক্টোস্কোপ যন্ত্র দিয়ে আভ্যন্তীন অবস্থা পরীক্ষা করা।পাইলসের অবস্থা দেখে যদি ডাক্তার মনে করেন যে ব্যাক্তির ওষুধ দিলেই সেরে যাবে তাহলে ওষুধ দেন আর যদি অবস্থা জটিল হয় তাহলে অপারেশন করার চিন্তা ভাবনা করেন। যদিও পাইলসের ক্ষেত্রে অপারেশন সর্বক্ষেএে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে তবুও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অপারেশন করার পরও আপনার লাইফস্টাইল পরিবর্তন না করার কারণে রোগটি পুনরায় দেখা দেয়। আশা করছি, পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় সম্পর্কে অবহিত করতে পেরেছি।
পাইলস এর লক্ষণ
পাইলসের অনেকগুলো লক্ষণ রয়েছে।চলুন একনজরে সেগুলো দেখে নেই -
- মলত্যাগের পর প্রচুর পরিমাণে রক্ত বের হওয়া
- মলদ্বারের পাশে একটি ছোট গলদার মতো থাকা।
- পায়খানা করার পর প্রচুর পরিমাণে অস্বস্তি
- মলদ্বারের চারপাশে চুলকানি ও ব্যাথা
- ব্যাথাহীন রক্তপাত
- অতিরিক্ত জ্বালা ও ব্যাথা
- মলদ্বারে টিউমার ও ছোট গুটি
- মলদ্বার কর্তৃক মিউকাস নি:সরণ
সুতরাং উপরোক্ত লক্ষণগুলো হচ্ছে পাইলসের লক্ষণ।
আরও পড়ুনঃ এক মাসের মধ্যে মোটা হওয়ার উপায়
পাইলস হওয়ার কারণ
পাইলস হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কারণ গুলো হচ্ছে -
- পায়ুপথে সহবাস করার কারণে পাইলস হতে পারে।
- কোন ধরনের শারিরীক পরিশ্রম না করা।
- অতিরিক্ত ওজন
- পুষ্টিকর খাবারের অভাব
- প্রেগনেন্সি বা গর্ভকালীন সময়ে
- দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য
- অতিরিক্ত ডায়রিয়া
- খাবারে আঁশযুক্ত খাবার কম পরিমানে থাকা
- দিনের বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে থাকা
- লিভার সিরোসিস বা যকৃতের অসুখ
- পারিবারিক ইতিহাস
- অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ করা
- আলসারেটিব কোনো ধরনের কোলাইটিস
- কম পরিমাণে জল খাওয়া
সুতরাং বলা যায়, উপরোক্ত কারণগুলোর জন্য পাইলস হতে পারে৷
আরও পড়ুনঃ মাসিকের কতদিন পর গর্ভধারণ হয়
পাইলস এর চিকিৎসা ওষুধ
পাইলস এর চিকিৎসা ওষুধ নিয়ে আর্টিকেলের এই পর্যায়ে জানতে পারবেন -
পাইলসের চিকিৎসা বিভিন্ন উপায়ে করা যায় যেমন সার্জারি, ওষুধ প্রয়োগ এবং ঘরোয়া উপায়। পাইলসের একটি কমন অয়েন্টমেন্ট হচ্ছে পাইলোসল। এই ওয়েন্টমেন্টে রয়েছে ক্যালসিয়াম ডোবেসাইলেট,ডেক্সামিথাসন এবং লিডোকাইন। আপনার যদি অল্প সময়ের জন্য পাইলসের এই সমস্যাটি হয়ে থাকে তাহলে এই অয়েন্টমেন্টটি ব্যবহার করতে পারেন।পায়ুপথের অসস্থি ও ব্যাথা দূর করার জন্য আরেকটি ক্রিম হচ্ছে হাইড্রোকর্টিসন। এতে থাকা স্টেরয়েড ব্যাথা ও চুলকানি কমাতে অনেক সাহায্য করে।
এগুলোর পাশাপাশি লাইফস্টাইল এবং খাদ্যাভাস পরিবর্তন করুন। পাইলসের সমস্যা বেশি হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কোথায় অবস্থিত
পাইলসের ব্যাথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
এই পর্যায়ে আমরা আলোচনা করবো -পাইলসের ব্যাথা কমানোর ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে।
ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি ঘরোয়া কিছু উপায় অবলম্বন করেও আপনি সহজে পাইলসের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন যেমন :
নারকেল তেল :
নারকেল তেল পাইলসের সমস্যার জন্য খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। পাইলসের জন্য যে ইনফ্লামেটরি সৃষ্টি হয় তা প্রতিরোধ করতে নারকেল তেল খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। নারকেল তেল লাগানোর জন্য প্রথমে মলদ্বারটি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধূয়ে ফেলুন। তারপর দিনে কয়েকবার কটনে করে তেল নিয়ে পায়ুপথে লাগান।
কোল্ড কম্প্রেস :
আপনার পাইলসের স্থানে যদি কোল্ডের প্যাক মানে ১০-১২ টি বরফ একসাথে করে লাগান তাহলে ফোলাভাব অনেক কমে যাবে এবং ব্যাথাও কমবে পাশাপাশি রক্তনালী সমূহ সংকোচিত হবে। এটি ১০-১৫ মিনিটের জন্য রেখে দিতে পারেন।
সুকুমার ঘৃত :
এটি হচ্ছে এমন একটি ঘি ভিওিক আয়োর্বেদিক মলম যা ঘা এর বৈশিষ্ট্য নিরাময় করার জন্য খুবই উপকারী। কাজেই আপনার যদি এই মলমটি আপনার পাইলসে ব্যবহার করেন তাহলে অনেক আরাম পাবেন।
অ্যালোভেরা:
শরীরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য অ্যালোভেরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আপনি যদি প্রতিদিন পাইলসের জায়গায় কয়েকবার অ্যালোভেরা জেল লাগান তাহলে আপনার পাইলসের সমস্যা অতি দ্রুত কমে যাবে।
পানি
শরীরের প্রায় সমস্ত কার্যক্রম পানির উপর নির্ভরশীল। আর পায়খানা শক্ত হয়ে যায় মূলত কম পানি পান করার কারণে।এতে আরো বেশি সমস্যা হতে পারে। এজন্য ডাক্তাররা পাইলসের রোগীদের দৈনিক তিন থেকে চার লিটার পানি পান করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে পানির সাথে আপনি ডাবের পানি, পানীয় ,স্যুপ ও ডালের পানিও খেতে পারেন।
ভিনেগার :
অ্যাপেল সিডার ভিনেগার পাইলসের ক্ষেত্রে অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আপনি যদি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে অ্যাপেল সিডার ভিনেগার খান তাহলে এটি বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে। তাছাড়া একটি তুলোতে করে একটুখানি নিয়ে যদি আক্রান্ত স্থানে লাগান তাহলেও তা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিবে।
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল:
আপনি যদি প্রতিদিন একটু করে অলিভ অয়েল খেতে পারেন তাহলে তা ধীরে ধীরে আপনাকে পাইলস থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করবে।
সেইজ স্থান :
আপনি যদি প্রতিদিন পাইলস আক্রান্ত স্থানে ১০-১৫ মিনিট একটানা সাধারণ গরম জল দেন তাহলে অনেকটা স্বস্তি অনুভব করবেন।
লেবুর রস :
লেবুর রসে রয়েছে প্রাকৃতিক এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আপনি যদি আদা, মধুর সাথে মিশিয়ে খান তাহলে অনেক ভালো উপকার হবে। এছাড়া আক্রান্ত স্থানেও আপনি লেবুর রস লাগাতে পারেন।
সুতরাং বলা যায় যে, আপনি যদি উপরোক্ত ঘরোয়া পদ্ধতি গুলো মেনে চলেন তাহলে সহজেই পাইলস এর থেকে মুক্তি পাবেন।
আরও পড়ুনঃসিজারের পর ইনফেকশনের লক্ষণ
লেখকের মন্তব্য - পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায়
আমাদের আজকের এই আর্টিকেলে পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায় এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আমি যদি আপনার খাদ্যাভাস এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন করেন তাহলে সহজেই পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে পারেন। সবসময় সুস্থ জীবন যাপন করার চেষ্টা করুন। আর্টিকেল সম্পর্কে আপনার মতামত, পরামর্শ কিংবা প্রশ্ন আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। এরকম আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমৃদ্ধ আর্টিকেল পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট My Teach Info। ধন্যবাদ।
My Teach Info এরনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url